প্রকাশের সময় :
একটি রাজনৈতিক দলের আসল শক্তি শুধু ভোটে নয়, শুধু মিছিলেও নয়। দলের প্রকৃত শক্তি তার ত্যাগী নেতা-কর্মীরা। দুঃসময়ে যারা পাশে থাকেন, ঝুঁকি নেন এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের আদর্শ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন- তারাই একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত সম্পদ।প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ পেয়েছে। গত প্রায় ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রতিকূল সময়ে দলের অনেক নেতা-কর্মী রাজপথে ছিলেন। কেউ মামলা মোকাবিলা করেছেন, কেউ গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কেউ চাকরি হারানোর ঝুঁকি নিয়েছেন, কেউ ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকে সামাজিক চাপ ও নানা প্রতিকূলতা সহ্য করেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকেছেন।
এই সংগ্রামে শুধু পেশাদার রাজনীতিবিদরাই ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রত্যাশা ছিল- সুদিন এলে তাদের ত্যাগ ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হবে।
কিন্তু এখন অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে- দুঃসময়ের সেই মানুষগুলো কি যথাযথভাবে মূল্যায়িত হচ্ছেন?
প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
যোগ্যতার সঙ্গে ত্যাগের মূল্যায়ন
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা যায়। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও ট্রেজারারের মতো পদগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদ শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বের নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরিতেও এসব পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অতএব, এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম বিবেচ্য হওয়া উচিত যোগ্যতা, সততা, একাডেমিক অবদান, গবেষণা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা। একই সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কার কী ভূমিকা ছিল, সেটিও একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
কারণ দীর্ঘদিন বিরোধী অবস্থানে থাকা একটি দলের সঙ্গে প্রকাশ্যে থাকার যে ঝুঁকি, তা সবাই নেননি। কেউ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কেউ পাশে থেকেছেন, আবার কেউ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন। সুসময়ে যদি এই পার্থক্য পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতের দুঃসময়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে একটি প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক- ত্যাগ করে লাভ কী?
এটি শুধু আবেগের বিষয় নয়; রাজনৈতিক সংগঠনের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক সংস্কৃতির সঙ্গেও বিষয়টি জড়িত।
ত্যাগী হলেই পদ নয়, আবার ত্যাগ উপেক্ষাও নয়
এখানে একটি ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরি।
ত্যাগী হলেই যে কাউকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ দিতে হবে- এমন নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে অযোগ্য কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোও সমর্থনযোগ্য নয়।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার নয়; এগুলো জনস্বার্থে দায়িত্ব পালনের জায়গা।
তাই নীতি হওয়া উচিত- ত্যাগের মর্যাদা থাকবে, কিন্তু যোগ্যতার সঙ্গে আপস হবে না।
একজন প্রার্থীকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তার একাডেমিক ও পেশাগত যোগ্যতা, গবেষণা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের দক্ষতা, সততা এবং জনস্বার্থে অবদানের পাশাপাশি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূল সময়ে তার ভূমিকার তথ্যও বিবেচনা করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে যোগ্য ও ত্যাগী মানুষকে।
আগের ভূমিকার মূল্যায়নেও চাই ন্যায়বিচার
প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের অতীত ভূমিকা নিয়েও মানুষের মধ্যে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু কাউকে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অপসারণ বা বঞ্চিত করা সমাধান নয়।
কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। প্রয়োজন হলে তদন্ত করতে হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারই হওয়া উচিত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি।
সরকার পরিবর্তনের অর্থ শুধু চেয়ার বদলানো নয়। এর সঙ্গে নিয়োগের সংস্কৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
এখানেই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রয়োজন স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা করা যেতে পারে।
প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে-
- একাডেমিক যোগ্যতা ও গবেষণা;
- প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা;
- নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা;
- সততা ও পেশাগত সুনাম;
- জনস্বার্থে অবদান;
- সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য;
- গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা ও ত্যাগের তথ্য।
একই ধরনের নীতি সাংবাদিকতা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি ও অন্যান্য পেশাজীবী ক্ষেত্রেও বিবেচনা করা যেতে পারে।
এতে একদিকে যেমন যোগ্য ব্যক্তিরা সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অযোগ্য ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার সুযোগও কমবে।
তথ্যের উৎসও হতে হবে নির্ভরযোগ্য
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে যেসব তথ্য বা সুপারিশ পৌঁছায়, সেগুলোর উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য- তা যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি নিজেদের স্বার্থে ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সুপারিশ দেয়, তাহলে এর প্রভাব পড়তে পারে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও সিদ্ধান্তে।
তাই সুপারিশের পাশাপাশি তথ্যের উৎস, তথ্যের সত্যতা এবং স্বার্থের সংঘাত যাচাইয়ের একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
ত্যাগের স্বীকৃতি শুধু পদ দিয়ে নয়
দুঃসময়ের সব ত্যাগী মানুষকে রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক পদ দেওয়া সম্ভব নয়। সেটি প্রয়োজনীয়ও নয়।
কিন্তু তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব। বিভিন্ন কমিটি, গবেষণা, শিক্ষা, নীতি প্রণয়ন, জনসেবা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
এতে ত্যাগী নেতা-কর্মীরা সম্মানিত বোধ করবেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে- সংকটের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো মূল্যহীন নয়।
ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন
একটি রাজনৈতিক দল শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্যও কাজ করে।
দুঃসময়ে যারা সামনে ছিলেন, সুসময়ে যদি তাদের উপেক্ষা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতের নেতা-কর্মীদের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে। তারা মনে করতে পারেন, সংকটে সামনে থাকার চেয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকাই হয়তো বেশি লাভজনক।
এ ধরনের সংস্কৃতি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক নয়।
তাই প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা। দুঃসময়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী পেশাজীবীদের তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তাদের রাজনৈতিক ও পেশাগত অবদান যাচাই করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের অতীত ভূমিকা, যোগ্যতা ও সততার বিষয়টিও নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
এতে কাউকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করার সুযোগ যেমন কমবে, তেমনি শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অযোগ্য কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার ঝুঁকিও কমবে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রী যদি একটি বিষয় স্পষ্ট করেন- ত্যাগ সম্মান পাবে, যোগ্যতা অগ্রাধিকার পাবে এবং অন্যায় কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে আশ্রয় পাবে না- তাহলে দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করে, যেখানে প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার থাকবে; অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে; তোষামোদের পরিবর্তে সততা গুরুত্ব পাবে।
আর যারা দুঃসময়ে পাশে ছিলেন, তাদের ত্যাগও বিস্মৃত হবে না।
ক্ষমতা আসে-যায়। পদ আসে-যায়। কিন্তু ত্যাগের ইতিহাস থেকে যায়।
সেই ইতিহাসের প্রতি সম্মান দেখানো শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি দায়িত্ব নয়; এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিও দায়িত্ব।
দুঃসময়ের ত্যাগীদের যথাযথ মূল্যায়ন করুন। যোগ্যতার সঙ্গে ত্যাগের মর্যাদা দিন। কারণ ত্যাগী ও যোগ্য মানুষকে সম্মান করা মানেই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা।
লেখক: অধ্যাপক (কৃষি) ও সাবেক ডিন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন অনুষদ এবং সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।